- বহুমূত্ররোগ বা ডায়াবেটিস বা মধুমেহ (যা ডায়াবেটিস মেলাইটাস নামেও পরিচিত) হলো একটি গুরুতর, দীর্ঘমেয়াদি অবস্থা যেটি ঘটে যখন রক্তের গ্লুকোজ মাত্রা দীর্ঘসময় ধরে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে, কারণ হয় শরীর যথেষ্ট পরিমাণে বা কোনো ইনসুলিন উৎপাদন করে না অথবা উৎপাদিত ইনসুলিন কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে না।[১১] উপসর্গগুলো হলো ঘনঘন প্রস্রাব (পলিইউরিয়া), অত্যধিক তৃষ্ণা (পলিডিপসিয়া) এবং অত্যধিক ক্ষুধা (পলিফেজিয়া)।[২] চিকিৎসা না করালে অনেক জটিলতার সৃষ্টি হয়।[২] তাৎক্ষণিক জটিলতার মধ্যে রয়েছে ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিস, হাইপারঅসমোলার হাইপারগ্লাইসিমিক স্টেট অথবা মৃত্যু।[৩] গুরুতর দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার মধ্যে রয়েছে হৃদ্যন্ত্র ও রক্তবাহের রোগ, স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক, ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি, ডায়বেটিসজনিত পায়ের ক্ষত, ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি, ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথি ও চিন্তাশক্তির লোপ।[২][৫]
- বহুমূত্ররোগে হয় অগ্ন্যাশয় ঠিকমতো ইনসুলিন উৎপাদন করে না অথবা উৎপাদিত ইনসুলিনের প্রতি দেহের কোষগুলো যথাযথভাবে সাড়া প্রদান করে না।[১২] বহুমূত্ররোগের তিনটি প্রধান ধরন রয়েছে:[২]
- টাইপ ১ ডায়াবেটিস হয় যখন অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষ বিনষ্ট হওয়ার ফলে যথেষ্ট পরিমাণে ইনসুলিন উৎপাদিত হয় না।[২] পূর্বে এটি ইনসুলিন-নির্ভরশীল ডায়াবেটিস মেলিটাস অথবা জুভিনাইল ডায়াবেটিস নামে পরিচিত ছিল।[২] বিটা কোষ বিনষ্ট হওয়ার কারণ হলো অটোইমিউন বিক্রিয়া[১৩] অটোইমিউনের সঠিক কারণ এখনও অজানা।[২] বিটা কোষ ধ্বংসের হার বিভিন্ন ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন হয়ে থাকে। এটি যে-কোনো বয়সে হতে পারে, তবে শিশু ও তরুণদের মধ্যে এই হার সবচেয়ে বেশি। ১০-১৪ বছর বয়সিদের ক্ষেত্রে এই হার শিখরে পৌঁছে।[১৪]
- টাইপ ২ ডায়াবেটিস শুরু ইনসুলিন রোধ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যেখানে কোষ ইনসুলিনের প্রতি যথাযথ সাড়া প্রদানে ব্যর্থ হয়।[২] রোগের বয়স বাড়ার সাথে সাথে ইনসুলিনের ঘাটতিও তৈরি হয়।[১৫] এটি পূর্বে ইনসুলিন-অনির্ভরশীল ডায়াবেটিস মেলিটাস নামে পরিচিত ছিল।[২] গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলো হলো শরীরের অত্যধিক ওজন ও কায়িকশ্রমের অভাব।[২]
- গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হলো তৃতীয় প্রধান ধরন। এটি হয় যখন একজন গর্ভবতী মহিলা যার ইতঃপূর্বে কখনো ডায়াবেটিসের ইতিহাস ছিল না কিন্তু গর্ভধারণ করার পর রক্তের গ্লুকোজ মাত্রা বেড়ে যায়।[২]
- বহুমূত্ররোগ চিকিৎসা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হচ্ছে রক্তের গ্লুকোজ মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে না কমিয়ে বরং স্বাভাবিকের কাছাকাছি রাখার চেষ্টা করা। খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন,[১০৯] কায়িক শ্রম, ওজন হ্রাস ও যথাযথ ওষুধ (ইনসুলিন, মুখে সেবনীয় ওষুধ) ব্যবহারের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। রোগ সম্পর্কে জানা ও চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণ খুব জরুরি, কারণ যে-সকল ব্যক্তি রক্তের গ্লুকোজ মাত্রা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছে তাদের ক্ষেত্রে জটিলতার পরিমাণ ও তীব্রতার মাত্রা উভয়ই কম।[১১০][১১১] আমেরিকান কলেজ অব ফিজিশিয়ান-এর মতানুসারে চিকিৎসা লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে HbA1C ৭-৮%।[১১২] অন্যান্য স্বাস্থ্যগত সমস্যা যেগুলো বহুমূত্ররোগের নেতিবাচক প্রভাবকে ত্বরান্বিত করতে পারে সেগুলোর দিকেও নজর দেওয়া উচিত। এগুলো হলো ধূমপান, উচ্চ রক্তচাপ, বিপাকীয় সিনড্রোম, অতিস্থূলতা ও নিয়মিত কায়িক শ্রমের অভাব।[১১৩] যাদের পায়ে ঘা হওয়ার সম্ভাবনা আছে তাদের জন্য বিশেষায়িত জুতা ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়, যদিও এর কার্যকারিতার প্রমাণ দ্ব্যর্থবোধক।[১১৪] বহুমূত্ররোগে আক্রান্ত সাধারণ জনগণের জন্য এর চিকিৎসা ব্যবস্থার নিয়মনীতি প্রায় একইরকম, তবে কিছু বিশেষ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ কিছু ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। যারা তীব্র মানসিক রোগে আক্রান্ত তাদের ক্ষেত্রে টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগের স্ব-চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা কতটুকু কার্যকর তা নিয়ে গবেষণালব্ধ তথ্যের ঘাটতি রয়েছে।[১১৫]
-
বংশগতি প্রবণতা
- জিনগত বিষয় দ্বারা টাইপ ১ ডায়াবেটিস ব্যাপকভাবে প্রভাবিত, কিন্তু এটি বংশগতির সরল মেন্ডেলীয় সূত্র অনুসরণ করে না। অভিন্ন যমজের ক্ষেত্রে এই রোগে একজন আক্রান্ত হলে অপরজনের হওয়ার সম্ভাবনা ৩০%-৫০%, অন্যদিকে ভিন্ন যমজের ক্ষেত্রে এই হার ৬%-১০%। যুক্তরাষ্ট্রে, কোনো ব্যক্তির প্রথম স্তরের আত্মীয়-স্বজনের টাইপ ১ ডায়াবেটিস থাকলে তার নিজের ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি ১:২০, সাধারণ জনগণের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি ১:৩০০। মা টাইপ ১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে সন্তানের টাইপ ১ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি ১%-৪%, অপরদিকে, পিতা আক্রান্ত হলে এই ঝুঁকি বেড়ে ১০% হয়ে যায়। যদি পিতা-মাতা উভয়ের টাইপ ১ ডায়াবেটিস থাকে, সেক্ষেত্রে সন্তানের এটি হওয়ার ঝুঁকি ৩০%।[৭০] পরিবারের এক সন্তান টাইপ ১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে অপর সন্তানের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ৪-৬%। এই বংশগতির সংশ্লিষ্টতা থাকা সত্ত্বেও দেখা যায় প্রতিবছর ৮০%-৮৫% নতুন শনাক্তকৃত টাইপ ১ ডায়াবেটিস রোগীর কোনো পারিবারিক ইতিহাস থাকে না। HLA-সংবেদনশীল জিনবিশিষ্ট ব্যক্তির ১০% টাইপ ১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়। এর অর্থ দাঁড়ায় টাইপ ১ ডায়াবেটিস হওয়ার জন্য কেবল জিনগত বিষয় সম্পূর্ণভাবে দায়ী নয়, পরিবেশগত বিষয়াবলিও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।[১৪]
-
পরিবেশগত প্রবণতা
- টাইপ ১ ডায়াবেটিস সংঘটনে বিস্তর ভৌগোলিক ও ঋতুগত বিচিত্রিতা লক্ষ্য করা যায়, এছাড়া কম ডায়াবেটিস হয় এমন দেশ থেকে যখন লোকজন বেশি ডায়াবেটিস হয় এমন দেশে গিয়ে বসবাস শুরু করে তখন দেখা যায় এসকল অভিবাসী লোকজনেরও স্থানীয় লোকজনের মতো একই হারে ডায়াবেটিস হচ্ছে। এসকল বিষয় দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, টাইপ ১ ডায়াবেটিস রোগ সংঘটনে পরিবেশগত বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যদিও অনেক অনুকল্প বা হাইপোথিসিস রয়েছে, তথাপি এসকল পরিবেশগত বিষয়গুলোর প্রকৃতি অজানা। এগুলো β কোষের ওপর সরাসরি বিষক্রিয়া করে অথবা β কোষের বিরুদ্ধে অটোইমিউন বিক্রিয়াকে উদ্দীপিত করে। সম্ভাব্য বিষয়গুলো নিম্নোক্ত চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়:
- ভাইরাস: এন্টারোভাইরাসসহ (যেমন কক্সস্যাকিভাইরাস বি৪) অন্যান্য ভাইরাসগুলো হলো মাম্পস ভাইরাস, রুবেলা ভাইরাস, সাইটোমেগালোভাইরাস, এপস্টাইন-বার ভাইরাস ও রেট্রোভাইরাস।[৭০]
- টক্সিন বা বিষ: বিভিন্ন খাদ্যে বিদ্যমান নাইট্রোস্যামিন (ধোঁয়া ও লবণ দিয়ে প্রক্রিয়াজাতকৃত মাংসে পাওয়া যায়) ও কফি। গোরুর দুধের অন্যতম একটি প্রধান উপাদান বোভাইন সিরাম অ্যালবিউমিন (BSA) এই রোগের সাথে জড়িত, তাই যেসব শিশুদের অল্প বয়স থেকে মায়ের দুধের পরিবর্তে গোরুর দুধ পান করানো হয় তাদের টাইপ ১ ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এই প্রোটিনটি নবজাতকের অন্ত্র প্রাচীর ভেদ করে রক্তে প্রবেশ করে এবং অ্যান্টিবডি তৈরি করে যা বিটা কোষের হিটশক বা তাপ অভিঘাত প্রোটিনের সাথে বিক্রিয়া করে।[৭০]
- স্বাস্থ্যবিধি অনুকল্প: শৈশবের প্রথমদিকে জীবাণুর সংস্পর্শে কম আসলে দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা পরিপক্ক হওয়ার সুযোগ কম পায় এবং অটোইমিউন রোগ হওয়ার প্রবণতা বাড়ে। এটি হাইজিন হাইপোথিসিস বা স্বাস্থ্যবিধি অনুকল্প নামে পরিচিত।[১৪][৭০]
- ভিটামিন ডি: যেহেতু যেসব অঞ্চলে সূর্যালোক কম (উত্তর ইউরোপসহ) সেখানে ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা বেশি, তাই ভিটামিন ডি এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে বলে মনে করা হয়। তবে কোনো পরিষ্কার নিদান-প্রভাব সম্পর্ক শনাক্ত করা যায়নি।[৭০]
বহুমূত্ররোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অধিকাংশ ওষুধ বিভিন্ন পদ্ধতিতে রক্তের গ্লুকোজ মাত্রা কমানোর মাধ্যমে কাজ করে। এই বিষয়ে সবাই একমত যে, যখন একজন ডায়াবেটিসের রোগী খুব কঠোরভাবে রক্তের গ্লুকোজ মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করেন, তখন জটিলতাগুলো খুব কম হয়, যেমন বৃক্কের সমস্যা অথবা চোখের সমস্যা।[১২৬][১২৭] তবে প্রবীণ ব্যক্তি যাদের ক্ষেত্রে হাইপোগ্লাইসিমিয়ার ঝুঁকি অধিক তাৎপর্যপূর্ণ, তাদের ক্ষেত্রে এসব ওষুধ কতটুকু যথাযথ ও খরচ সাধ্য তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।[১২৮]
টাইপ ২ ডায়াবেটিসে ব্যবহৃত অধিকাংশ ওষুধই অন্তর্জাত ইনসুলিন সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল হওয়াই টাইপ ১ ডায়াবেটিস রোগীদের ওপর কাজ করে না। পূর্বে সালফোনিলিউরিয়া ও বাইগুয়ানাইড ছিল চিকিৎসার প্রধান অবলম্বন, তবে বর্তমানে বিবিধ প্রকারের নতুন ওষুধ রয়েছে।
- বাইগুয়ানাইড
বর্তমানে মেটফরমিন হলো একমাত্র বাইগুয়ানাইড ওষুধ যা বাজারে বিদ্যমান। ইউকে প্রসপেক্টিভ ডায়াবেটিস স্টাডি-তে দেখা গিয়েছে যে, মেটফরমিন মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায় এবং বর্তমানে এটি টাইপ ২ ডায়াবেটিসে প্রথম সারির চিকিৎসা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।[৮] মেটফরমিন সেবনে প্রায় ২৫% ব্যক্তির ক্ষেত্রে মৃদু জঠরান্ত্রিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (উদরাময়, ঔদরিক ব্যথা, পেট ফাঁপা ও বমনেচ্ছা) দেখা দেয় এবং কেবল ৫% ব্যক্তি নিম্ন মাত্রায় সেবনেও এটি সহ্য করতে পারে না। এটি ইনসুলিন সংবেদনশীলতা ও প্রান্তীয় গ্লুকোজ ব্যবহার বাড়ায় এবং অন্ত্র ও যকৃতে গ্লুকোজ শোষণ ও উৎপাদন ব্যাহত করে।[১২৯] গ্লুকোজ মাত্রা কমানোর কাজটি করতে এর অন্তর্জাত ইনসুলিনের প্রয়োজন পড়ে, তবে এটি ইনসুলিন ক্ষরণ বৃদ্ধি করে না তাই হাইপোগ্লাইসিমিয়াও করে না। মেটফরমিন ওজন বৃদ্ধি করে না তাই অতিস্থূল ব্যক্তিদের জন্য পছন্দনীয় ওষুধ। অতিরিক্ত মদ্যপায়ী, বৃক্ক ও যকৃতের রোগে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এটি ব্যবহার করা যায় না।নিম্ন মাত্রায় সেবনেও এটি সহ্য করতে পারে না। এটি ইনসুলিন সংবেদনশীলতা ও প্রান্তীয় গ্লুকোজ ব্যবহার বাড়ায়।[১১৬]

- সালফোনিলিউরিয়া
সালফোনিলিউরিয়া গোষ্ঠীভুক্ত ওষুধগুলো অগ্ন্যাশয়িক β কোষ থেকে ইনসুলিন নিঃসরণ উদ্দীপিত করে (ইনসুলিন নিঃসারক)। যে-সকল টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীর ওজন স্বাভাবিক এবং খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হচ্ছে না, তাদের ক্ষেত্রে এ-জাতীয় ওষুধ খুবই উপযোগী। এ-জাতীয় ওষুধ ওজন বৃদ্ধি করে, তবে দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারে মাইক্রোভাস্কুলার জটিলতা হ্রাস পায়। গ্লিক্লাজাইড ও গ্লিপিজাইড অপেক্ষাকৃত কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া করে, কিন্তু গ্লাইবেনক্ল্যামাইড দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করায় প্রবীণদের হাইপোগ্লাইসিমিয়া করতে পারে।[১১৬]
- মেগ্লিটিনাইড অ্যানালগ
এই গোষ্ঠীভুক্ত ওষুধগুলো হলো রিপ্যাগ্লিনাইড ও ন্যাটিগ্লিনাইড। রিপ্যাগ্লিনাইড গঠনগত দিক দিয়ে গ্লাইবিউরাইড বা গ্লাইবেনক্ল্যামাইডের মতো। এটি খুব দ্রুত আহার পরবর্তী ইনসুলিন মাত্রা বাড়িয়ে আহার পরবর্তী গ্লুকোজ বৃদ্ধি ঠেকাতে পারে। এটি ওজন বাড়ায় এবং হাইপোগ্লাইসিমিয়া করতে পারে।[১২১]
- আলফা গ্লুকোসাইডেজ সম্বাধক
এই গোষ্ঠীভুক্ত ওষুধগুলো হলো অ্যাকারবোস, মিগ্লিটল ও ভোগ্লিবোস। এগুলো অন্ত্রে শর্করা শোষণ বিলম্বিত করে। খাবার পরে খেতে হয় এবং আহার-পরবর্তী রক্তের গ্লুকোজ কমায়। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে পেট ফাঁপা ও পেট ফুলে যাওয়া ও উদরাময়।[১২১]
- থায়াজলিডিনডায়োন
এগুলো সংক্ষেপে গ্লিটাজন নামেও পরিচিত। এরা মেদ কলায় প্রাপ্ত পারঅক্সিসোম প্রলিফারেটর-অ্যাক্টিভেটেড রিসেপ্টর-γ এর সাথে বন্ধন তৈরি করে একে সক্রিয় করে এবং অন্তর্জাত ইনসুলিনের কাজ কে বৃদ্ধি করে। এটি প্লাজমা বা রক্তরস ইনসুলিন ঘনত্ব বাড়ায় না ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রাও কমে না। গ্লিটাজনসমূহ ১৯৯০ সাল থেকে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, তবে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যাওয়ায় এগুলোর ব্যবহার কিছুটা কমেছে। প্রতিবেদনে হার্ট অ্যাটাক বৃদ্ধির প্রমাণ পাওয়ায় ২০১০ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে রসিগ্লিটাজন প্রত্যাহার করা হয়।[৭০] পায়োগ্লিটাজন হার্ট অ্যাটাক না বাড়ালেও হৃদ্বৈকল্যের হার বাড়ায়, সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুসারে অস্থিভঙ্গ ও সম্ভাব্য মূত্রাশয় ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। এসব পর্যবেক্ষণ পায়োগ্লিটাজোনের ব্যবহার নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দিয়েছে। ইনসুলিন রোধ সমস্যায় পায়োগ্লিটাজোন খুবই কার্যকর, এটি সাধারণত মেটফরমিনের সাথে যুক্ত করে ব্যবহৃত হয়। এটি ইনসুলিনের সাথেও ব্যবহার করা যায়, তবে দেহে জল ধারণ অনেক বেশি বেড়ে যাওয়ায় হৃদ্বৈকল্যের হার বেড়ে যায়। উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর বিরূপ প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে ওষুধ দুটি নিষিদ্ধ করে।[১৩০][১৩১] পায়োগ্লিটাজন যখন ইনসুলিনের সাথে ব্যবহার করা হয়, তখন ইনসুলিনের ডোজ ৩০-৩৫% পর্যন্ত কম লাগতে পারে।[১২১]
- SGLT-2 সম্বাধক
সোডিয়াম-গ্লুকোজ সহ-পরিবাহক ২ সম্বাধকগুলো আপেল গাছের বাকল থেকে উদ্ভূত এবং ২০১৩ সাল থেকে টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত। এই গোষ্ঠীভুক্ত ওষুধগুলো হলো ড্যাপাগ্লিফ্লোজিন, ক্যানাগ্লিফ্লোজিন ও এমপাগ্লিফ্লোজিন।
এগুলো খুবই কার্যকর মুখে সেবনীয় গ্লুকোজ কমানোর ওষুধ যা মেটফরমিনের পরে দ্বিতীয় সারির ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এগুলো ওজন কমাতে সাহায্য করে এবং হৃদ্যন্ত্র, রক্তবাহ ও বৃক্কের জটিলতা কমাতে সহায়ক যা ডায়াবেটিসের চিকিৎসার বৈপ্লবিক উন্নতি সাধন করেছে। ড্যাপাগ্লিফ্লোজিন টাইপ ১ ডায়াবেটিসে ব্যবহারের জন্যও অনুমোদিত, তবে খুবই সতর্কতার সাথে ব্যবহার করতে হবে কারণ এটি কিটোজেনেসিসের ঝুঁকি বাড়ায়। SGLT-2 সম্বাধক ওষুধগুলো টাইপ ১ ডায়াবেটিস ও কিটোসিস-প্রবণ বা অনেক ইনসুলিন ঘাটতি রয়েছে এমন টাইপ ২ ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে ব্যবহার না করাই উচিত।[১২১] প্রধান বিরূপ প্রতিক্রিয়া ( মোট ওষুধ সেবনকারীর ৫-১০%) হলো জননাঙ্গের ছত্রাক সংক্রমণ, বিশেষ করে Candida albicans নামক ছত্রাক সংক্রমণ। মূত্র সংক্রমণও অন্যতম একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়া এবং খুব বিরল ক্ষেত্রে গুরুতর জননাঙ্গের সংক্রমণ (যেমন ফোরনিয়ার গ্যাংগ্রিন বা মাংসপূতি)। ব্যবস্থাপত্র প্রদানকারীদের উচিত এ-সকল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রোগীকে জানিয়ে দেওয়া যেন সংক্রমণ চিকিৎসায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া যায়; জননাঙ্গের স্বাস্থ্যবিধি ভালো করে মেনে চলাও জরুরি। একবার রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে চলে আসলে, জননাঙ্গের সংক্রমণ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়।[৭০]
- ইনক্রেটিন-ভিত্তিক মুখে সেবনীয় ওষুধ
গ্লুকোজ শিরাপথে না দিয়ে মুখে খেলে অন্ত্র থেকে গ্লুকাগন-সদৃশ পেপটাইড ১ (GLP-১) ও গ্যাস্ট্রিক ইনহিবিটরি পলিপেপটাইড (GIP) নামক দুটি হরমোন নিঃসৃত হয় যাদের সমষ্টিগত নাম ইনক্রেটিন। এই হরমোনের প্রভাবে ইনসুলিন ক্ষরণ বৃদ্ধি পায়। ডাইপেপটিডিল পেপটিডেজ ৪ নামক উৎসেচক ইনক্রেটিন হরমোন কে ভেঙে দেয়। ডিপিপি-৪ সম্বাধক ওষুধগুলো ভাঙন প্রতিরোধ করে এবং অন্তর্জাত GLP-1 ও GIP-এর মাত্রা বাড়ায়। এই গোষ্ঠীভুক্ত ওষুধগুলো হলো সিটাগ্লিপটিন, ভিল্ডাগ্লিপটিন, লিনাগ্লিপটিন, সাক্সাগ্লিপটিন, অ্যালোগ্লিপটিন। এগুলো শরীরের সাথে খুবই ভালো মানানসই ও ওজন-নিরপেক্ষ। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন একটি সতর্কবার্তা দিয়েছে যে, ডিপিপি-৪ সম্বাধক ওষুধ সেবনে কখনো কখনো অস্থিসন্ধিতে ব্যথা হতে পারে এবং ওষুধ বন্ধ করার পর এটি সেরে যায়।[১২১]
শিরাপথে প্রদত্ত ওষুধ
- ইনক্রেটিন-ভিত্তিক
GLP-1 রিসেপ্টর অ্যাগনিস্ট গোষ্ঠীভুক্ত ওষুধগুলো অন্তর্জাত GLP-1 এর অনুরূপ তবে ডিপিপি-৪ উৎসেচক কে প্রতিরোধ করতে পারে। ডিপিপি-৪ সম্বাধকের চেয়ে এগুলোর বাড়তি সুবিধা হলো, এরা হাইপোথ্যালামাস পর্যায়ে ক্ষুধা নিবৃত্তি করে থাকে, ফলে এরা রক্তের গ্লুকোজ ও ওজন দুটোই কমায়। এই গোষ্ঠীভুক্ত ওষুধগুলো হলো এক্সেনাটাইড, লিরাগ্লুটাইড ইত্যাদি। ইনক্রেটিন-ভিত্তিক ওষুধগুলো হাইপোগ্লাইসিমিয়া করে না। এই গোষ্ঠীভুক্ত ওষুধগুলো অগ্ন্যাশয় প্রদাহের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, তাই যেসকল রোগী এই ওষুধ সেবন করছেন তারা পেটে তীব্র ব্যথা অনুভব করলে সাথে সাথে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।[১২১]
- ইনসুলিন
১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে ইনসুলিন আবিষ্কারের পূর্বে টাইপ ১ ডায়াবেটিস রোগীদের আয়ুষ্কাল ছিল মাত্র ৩-৪ মাস। অনেক রোগী ডায়াবেটিক কিটোঅ্যাসিডোসিসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছিল, তবে দৈনিক ৫০০-৭০০ ক্যালরি খাদ্যগ্রহণ করে কয়েক বছর বেঁচে থাকা সম্ভব হতো। ইনসুলিনকে à