ডেঙ্গু জ্বর

ডেঙ্গু জ্বর একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রধানত এডিস ইজিপ্টাই ও এডিস অ্যালবোপিক্টাস প্রজাতির মশার মাধ্যমে ছড়ায়, যা বাংলাদেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ, সঠিক চিকিৎসা ও প্রতিরোধই জটিলতা কমাতে সহায়ক হতে পারে।

ডেঙ্গুর কারণ ও কীভাবে ছড়ায়

সিডিসি তথ্য অনুযায়ী, ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ধরন (DENV 1-4) এডিস আগিপ্টি মশার মাধ্যমে ছড়ায়। এই মশাগুলো সাধারণত সকালে এবং বিকেলের শেষ দিকে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে এবং পরিষ্কার জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। ভাইরাসটি সরাসরি একজন মানুষ থেকে অন্য মানুষের মধ্যে ছড়ায় না, ভাইরাসটি এক আক্রান্ত ব্যক্তির থেকে অন্য ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দিতে মশা একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।

এডিস মশার সাধারণ বংশবিস্তারের স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • ফুলের পাত্র ও ট্রে
  • খোলা পানির পাত্র
  • ছাদে জমে থাকা পানি
  • ব্যবহৃত টায়ার ও প্লাস্টিক পণ্য
  • নির্মাণাধীন এলাকা যেখানে পানি জমে থাকে

ঢাকা মতো শহুরে এলাকায় দুর্বল নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং ঘনবসতি বৃষ্টির সময় এই ভাইরাসজনিত রোগের দ্রুত বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর পরিস্থিতি

বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বর একটি সাধারণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা, যা প্রতি বছর বিশেষ করে বর্ষাকালে দেখা দেয়। এটি একটি ভাইরাসজনিত রোগ, এই ভাইরাস এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। এডিস মশা সাধারণত উষ্ণ, আর্দ্র পরিবেশে এবং জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে।

সাম্প্রতিক বছর গুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যার ফলে দেশের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। ডেঙ্গুর বিস্তার ও প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিই এই রোগের কমিউনিটি পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়া কমাতে সহায়ক হতে পারে।

ডেঙ্গুর  লক্ষণ ও উপসর্গঃ

সাধারণভাবে ডেঙ্গুর লক্ষণ হচ্ছে জ্বর। ১০১ ডিগ্রি থেকে ১০২ ডিগ্রি তাপমাত্রা থাকতে পারে। জ্বর একটানা থাকতে পারে, আবার ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে দেবার পর আবারো জ্বর আসতে পারে। এর সাথে শরীরে ব্যথা মাথাব্যথা, চেখের পেছনে ব্যথা এবং চামড়ায় লালচে দাগ (র‍্যাশ) হতে পারে। তবে এগুলো না থাকলেও ডেঙ্গু হতে পারে।

ডেঙ্গুর জ্বরের সময়কাল

সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ থাকে। কারণ এ সময়টিতে এডিস মশার বিস্তার ঘটে।কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে ডেঙ্গু জ্বরের সময়কাল আরো এগিয়ে এসেছে। এখন জুন মাস থেকেই ডেঙ্গু জ্বরের সময় শুরু হয়ে যাচ্ছে।

রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা ব্যবস্থা

ডেঙ্গু রোগের সঠিক নির্ণয়ের জন্য রোগীর উপসর্গসমূহ এবং ল্যাব টেস্ট দুটোই প্রয়োজন হয়। সাধারণত ব্যবহৃত টেস্ট গুলোর মধ্যে রয়েছে:

ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই এবং চিকিৎসা মূলত উপসর্গ নির্ভর। সাধারণ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে বিশ্রাম নেওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং জ্বর কমাতে প্যারাসিটামল সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনের মতো ওষুধ এড়িয়ে চলা উচিত, কারণ এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

কী খাবেন

প্রচুর পরিমাণে তরল জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে। যেমন – ডাবের পানি, লেবুর শরবত, ফলের জুস এবং খাবার স্যালাইন গ্রহণ করা যেতে পারে। এমন নয় যে প্রচুর পরিমাণে পানি খেতে হবে, পানি জাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে।

প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা

ডেঙ্গু প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বর্তমানে বাংলাদেশে এই মশাবাহিত জ্বরের জন্য কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা বা গ্রহণযোগ্য ভ্যাকসিন নেই। তাই ব্যক্তিগত এবং সামাজিকভাবে সবাইকে মিলে মশার বংশবিস্তার প্রতিহত করা এবং সংক্রমণের ঝুঁকি হ্রাস করার জন্য কাজ করতে হবে।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত প্রতিরোধমূলক উপায় হলো:

  • মশার সবচেয়ে সক্রিয় সময়- সকাল ও সন্ধ্যায় লম্বা হাতা শার্ট ও প্যান্ট পরিধান করা
  • DEET বা পিকারিডিন যুক্ত মশা প্রতিরোধক ক্রীম ব্যবহার করা
  • দিনেও মশারি ব্যবহার করা, কারণ এডিস মশা দিনেও সক্রিয় থাকে
  • জানালা ও দরজায় নেট বসানো
  • ভোর এবং সন্ধ্যার সময় অপ্রয়োজনীয় কাজে বাইরের যাওয়া এড়িয়ে চলা

এছাড়াও পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, যেমন:

  • নিয়মিত পানি সংরক্ষণের পাত্রগুলো পরিষ্কার করা এবং জমে থাকা পানি ফেলে দেওয়া
  • পানি সংরক্ষণের ট্যাংক ঢেকে রাখা
  • গাছের ট্রে এবং ছাদের ট্যাঙ্কে জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলা
  • নিজ বাসা এবং আবাসিক এলাকার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা

উপসংহার

ডেঙ্গু একটি সাধারণ রোগ এবং সঠিক ডেঙ্গু চিকিৎসার মাধ্যমে প্রায়শই কয়েক দিনের মধ্যেই এটি ভালো হয়ে যায়। অসুস্থ না হওয়ার জন্য এবং আপনার এলাকাকে ডেঙ্গুর হটস্পট থেকে রক্ষা করার জন্য সমস্ত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অনুসরণ করুন। আক্রান্ত হলে যথাযথ ওষুধ খাওয়া উচিত এবং চিকিৎসার পরামর্শ নেওয়া উচিত।

See our Product

 

 

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *