নাইজেরিয়ার ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং এটি প্রাচীন সভ্যতা, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল এবং স্বাধীনতা-উত্তর রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গঠিত হয়েছে। নিচে নাইজেরিয়ার ইতিহাসের প্রধান পর্যায়গুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো: [1, 2]
১. প্রাচীন সভ্যতা ও প্রাক-ঔপনিবেশিক আমল (খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ – ১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ)
-
- নক সভ্যতা (Nok Culture): খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ থেকে উত্তর নাইজেরিয়ায় এই সভ্যতার বিকাশ ঘটে, যা তাদের অনন্য পোড়ামাটির ভাস্কর্য এবং প্রাথমিক লৌহ গলানোর প্রযুক্তির জন্য পরিচিত। [1, 2, 3]
- আঞ্চলিক রাজ্যসমূহ: নাইজেরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে শক্তিশালী কিছু রাজ্য ও সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। যেমন—উত্তরাঞ্চলে হাউসা রাজ্য ও বর্নো সাম্রাজ্য, দক্ষিণ-পশ্চিমে ইয়োরুবা ও ওয়ো সাম্রাজ্য, এবং দক্ষিণ-পূর্বে বেনিন রাজ্য ও নরি রাজ্য。 [1, 2]
- ধর্মের আগমন: একাদশ শতাব্দীতে উত্তর নাইজেরিয়ায় বাণিজ্যের মাধ্যমে ইসলামের আগমন ঘটে。 পরবর্তীতে পঞ্চদশ শতাব্দীতে পর্তুগিজ বণিকদের মাধ্যমে দক্ষিণাঞ্চলে খ্রিস্টধর্মের প্রবেশ ঘটে。 [1]
- দাস ব্যবসা: ১৬শ থেকে ১৮শ শতাব্দীর মধ্যে ইউরোপীয় শক্তির সাথে যোগাযোগের ফলে নাইজেরিয়ার উপকূলীয় অঞ্চল দাস ব্যবসার একটি বড় কেন্দ্রে পরিণত হয়。 [1, 2]
২. ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন (১৮৬১ – ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দ)
- ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা: ১৮৫১ সালে ব্রিটিশরা লাগোসে আক্রমণ করে এবং ১৮৬১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে লাগোসকে ব্রিটিশ উপনিবেশ ঘোষণা করা হয়।
- নাইজেরিয়ার জন্ম (১৯১৪): ব্রিটিশ গভর্নর লর্ড ফ্রেডরিক লুগার্ড ১৯১৪ সালের ১ জানুয়ারি উত্তর ও দক্ষিণ নাইজেরিয়া প্রটেক্টরেটকে একত্রিত করে একক ‘নাইজেরিয়া’ গঠন করেন। এই জোরপূর্বক একীভূতকরণ ভিন্ন সংস্কৃতির নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এক দীর্ঘস্থায়ী অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়। [1, 2, 3, 4, 5]
৩. স্বাধীনতা ও প্রথম প্রজাতন্ত্র (১৯৬০ – ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দ)
-
- স্বাধীনতা লাভ: ১৯৬০ সালের ১ অক্টোবর নাইজেরিয়া ব্রিটিশ শাসন থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে এবং স্যার আবুবকর তাফাওয়া বালেওয়া দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন। [1, 2]
- প্রজাতন্ত্র ঘোষণা: ১৯৬৩ সালে নাইজেরিয়া নিজেকে একটি ফেডারেল প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করে। তবে প্রথম থেকেই বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠীর (যেমন- হাউসা, ইয়োরুবা, ইগবো) মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। [1, 2, 3]
৪. সামরিক অভ্যুত্থান ও গৃহযুদ্ধ (১৯৬৬ – ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দ)
-
- সামরিক শাসন: ১৯৬৬ সালের জানুয়ারিতে একটি রক্তাক্ত সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বালেওয়া নিহত হন এবং সামরিক শাসন শুরু হয়। একই বছর জুলাই মাসে আরেকটি পাল্টা অভ্যুত্থান ঘটে। [1, 2]
- বিয়াফ্রা যুদ্ধ (১৯৬৭ – ১৯৭০): দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের ইগবো জনগোষ্ঠী নাইজেরিয়া থেকে আলাদা হয়ে ‘বিয়াফ্রা প্রজাতন্ত্র‘ নামক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের ঘোষণা দিলে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। প্রায় তিন বছর স্থায়ী এই যুদ্ধে অনাহার ও সহিংসতায় ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষ মারা যায় এবং অবশেষে ১৯৭০ সালে বিয়াফ্রা পুনরায় নাইজেরিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়। [1, 2]
৫. তেলের উত্থান ও সামরিক একনায়কত্ব (১৯৭০ – ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দ)
-
- তেল সমৃদ্ধি (Oil Boom): ১৯৭০-এর দশকে নাইজেরিয়ায় প্রচুর খনিজ তেলের সন্ধান মেলে, যা দেশের অর্থনীতিকে বদলে দেয়। কিন্তু এই বিশাল সম্পদ রাজনৈতিক দুর্নীতি এবং সামরিক শাসকদের পকেটেই বেশি জমা হয়। [1, 2]
- পরপর অভ্যুত্থান: ১৯৭০ থেকে ১৯৯০-এর দশক পর্যন্ত নাইজেরিয়া একাধিক সামরিক একনায়কতন্ত্রের মধ্য দিয়ে যায় (যেমন- জেনারেল ওলুসেগুন ওবাসাঞ্জো, ইব্রাহিম বাবানগিদা, এবং সানি আবাচা)। ১৯৯৩ সালের গণতান্ত্রিক নির্বাচন সামরিক জান্তা বাতিল করে দিলে দেশটিতে তীব্র অস্থিরতা দেখা দেয়। [1]
৬. আধুনিক নাইজেরিয়া ও চতুর্থ প্রজাতন্ত্র (১৯৯৯ – বর্তমান)
- গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন (১৯৯৯): ১৯৯৯ সালে একটি নতুন সংবিধান গ্রহণের মাধ্যমে নাইজেরিয়ায় স্থায়ীভাবে বেসামরিক গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ফিরে আসে। ওলুসেগুন ওবাসাঞ্জো রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
- বর্তমান চ্যালেঞ্জ: বর্তমানে নাইজেরিয়া আফ্রিকার বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর একটি হলেও এটি বেশ কিছু সমস্যার মুখোমুখি। এর মধ্যে রয়েছে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বোকো হারাম জঙ্গি গোষ্ঠীর সহিংসতা, দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য। [1
- নাইজেরিয়ার মানুষের জীবনযাত্রা
২. প্রাণবন্ত খোলা বাজার (Vibrant Open Markets)
নাইজেরিয়ার অর্থনীতির ফুসফুস হলো তাদের ঐতিহ্যবাহী উন্মুক্ত বাজারগুলো। এখানকার মানুষ সুপারমার্কেটের চেয়ে খোলা বাজারে কেনাকাটা করতে বেশি পছন্দ করে। এই বাজারগুলো যেমন রঙিন, তেমনই কোলাহলপূর্ণ। এখানে সবজি, ফলমূল থেকে শুরু করে ঐতিহ্যবাহী আফ্রিকান কাপড় ও মশলা পাওয়া যায়।

৩. ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও উৎসব (Traditional Clothing & Celebrations)
নাইজেরিয়ার মানুষ তাদের পোশাকের ব্যাপারে অত্যন্ত গর্বিত। বিয়ে বা যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে তারা ‘আনকারা’ (Ankara) বা ‘লেস’ (Lace) কাপড়ের জমকালো ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান করে। উৎসবের দিনগুলোতে তাদের নাচ, গান এবং রঙিন ড্রামের ব্যবহার পুরো পরিবেশকে আনন্দমুখর করে তোলে।
বর্তমান নাইজেরিয়ার প্রধান প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বসমূহ নিম্নরূপ:
-
- প্রেসিডেন্ট: বোলা আহমেদ তিনুবু (Bola Ahmed Tinubu) [১.২.৪, ১.২.৭]
- ফার্স্ট লেডি: ওলুরেমি তিনুবু (Oluremi Tinubu) [১.৩.৩]
- শাসন ব্যবস্থা: ফেডারেল প্রেসিডেন্সিয়াল রিপাবলিক (যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র) [১.৩.৬] [1, 2, 3, 4]
বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ (Current Situation in 2026)
বর্তমানে নাইজেরিয়া একই সাথে অর্থনৈতিক সংস্কার এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার মতো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে:
-
- অর্থনৈতিক সংস্কার ও জীবনযাত্রার ব্যয়: প্রেসিডেন্ট তিনুবুর জ্বালানি তেলের ভর্তুকি প্রত্যাহার (Subsidy Removal) এবং মুদ্রা ব্যবস্থার সংস্কারের পর থেকে নাইজেরিয়ায় মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে [১.১.৫, ১.১.৮]। সরকার বর্তমানে এসব অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে [১.১.৫, ১.২.৫]।
- নিরাপত্তা সংকট: দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বোকো হারাম ও আইএসডব্লিউএপি (ISWAP) জঙ্গি গোষ্ঠীর তৎপরতা এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে সশস্ত্র ডাকাত ও অপহরণ চক্রের কারণে নিরাপত্তা পরিস্থিতি বেশ জটিল [১.১.৬]। তবে সাম্প্রতিক সময়ে নাইজেরিয়ার যৌথ নিরাপত্তা বাহিনী শত শত অপহৃত মানুষকে উদ্ধার করেছে এবং জঙ্গিবিরোধী অভিযান জোরদার করেছে [১.১.১, ১.১.৬]। [1, 2, 3, 4, 5]
- আন্তর্জাতিক অবস্থান: সমস্ত অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও নাইজেরিয়া আফ্রিকার অন্যতম বৃহত্তম অর্থনীতি এবং এই অঞ্চলে একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী রাষ্ট্র হিসেবে তার অবস্থান ধরে রেখেছে [১.১.৪]। সম্প্রতি দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ওয়ার্ল্ড এনার্জি কাউন্সিল’-এর জাতীয় সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে [১.২
Writer:Bulbul


