একটি হত্যাকাণ্ড, একের পর এক যুদ্ধ ঘোষণা, আর পরস্পরের সঙ্গে বাঁধা সামরিক জোট—সব মিলিয়ে শুরু হয়েছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম এক ভয়াবহ সংঘাত। ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এই বিশ্বযুদ্ধ চার বছর স্থায়ী হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নামে পরিচিত এই সংঘাতের বলি হয় লাখ লাখ মানুষ। আজ ২৮ জুলাই, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর ১১২তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এই ফিরে দেখা প্রকাশ করা হলো।

১৯১৪ সালের জুন মাসে অস্ট্রিয়ার যুবরাজ (আর্চডিউক) ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ ও তাঁর স্ত্রী সোফি রাষ্ট্রীয় সফরে বসনিয়ায় যান। সে সময় বসনিয়া–হার্জেগোভিনা ছিল অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চল। ২৮ জুন এই দম্পতি বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোতে মোতায়েন সাম্রাজ্য সেনাদের সঙ্গে দেখা করতে রওনা দেন।
যাওয়ার পথে তাঁদের গাড়িবহর লক্ষ্য করে গ্রেনেড হামলা হয়। তবে তখন অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান ফার্দিনান্দ। তিনি ও তাঁর স্ত্রী সোফি দুজনই অক্ষত থাকেন। হত্যাচেষ্টার পরও ফার্দিনান্দ সারায়েভোতে তাঁর নির্ধারিত কর্মসূচিগুলো চালিয়ে যেতে থাকেন।
একই দিন গাড়ি নিয়ে অন্য একটি জায়গায় যাওয়ার সময় গ্যাভরিলো প্রিন্সিপ নামে ১৯ বছর বয়সী এক বসনিয়ান সার্ব হামলাকারী ফার্দিনান্দের গাড়ির সামনে এসে পড়েন। এ যাত্রায় আর ভাগ্য সহায় হয়নি। প্রিন্সিপ খুব কাছ থেকে পরপর দুটি গুলি ছোড়েন। একটি গুলি ফার্দিনান্দকে, অন্যটি তাঁর স্ত্রী সোফিকে বিদ্ধ করে। মুহূর্তের মধ্যেই দুজনের মৃত্যু হয়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর অনেক আগেই ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য দুটি বড় জোট গঠন করেছিল। এসব জোটের সদস্যদেশগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কোনো একটি দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে অন্য সদস্যরাও তার পাশে দাঁড়াবে। ফলে ১৯১৪ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইউরোপ কার্যত দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদিকে ছিল ট্রিপল অ্যালায়েন্স (কেন্দ্রীয় শক্তি), অন্যদিকে ট্রিপল আন্তঁত (মিত্রশক্তি)।
এই হত্যাকাণ্ডের পর খুব দ্রুত পরিস্থিতি বদলে যায়। অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি এই হত্যাকাণ্ডের জন্য সার্বিয়া সরকারকে দায়ী করে। ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। আর এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় ভয়াবহ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, যা পরবর্তী কয়েক বছরে গোটা বিশ্বকে গভীর সংকটে ফেলে দিয়েছিল।
ফার্দিনান্দকে কেন নিশানা করা হয়
১৮৬৩ সালে জন্ম নেওয়া ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ ছিলেন তৎকালীন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সম্রাট ফ্রাঞ্জ জোসেফের ভাতিজা। ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ শুরুতে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হওয়ার দৌড়ে তৃতীয় স্থানে ছিলেন। তবে অন্য উত্তরাধিকারীদের মৃত্যুর কারণে তিনি প্রথম স্থানে চলে আসেন।
১৮৮৯ সালে সম্রাট ফ্রাঞ্জ জোসেফের ছেলে ও সিংহাসনের প্রথম উত্তরাধিকারী রুডলফ রহস্যজনকভাবে আত্মহত্যা করেন। এরপর ১৮৯৬ সালে সম্রাটের ছোট ভাই এবং দ্বিতীয় উত্তরাধিকারী কার্ল লুডভিগ টাইফয়েডে মারা যান। এতে লুডভিগের ছেলে ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ তাঁর চাচা সম্রাট ফ্রাঞ্জ জোসেফের প্রথম উত্তরসূরি হয়ে ওঠেন।
সম্রাট ফ্রাঞ্জ জোসেফ অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরিকে নিয়ে দ্বৈত এক রাজতন্ত্র পরিচালনা করতেন। দুই অংশের শাসনব্যবস্থা আলাদা হলেও শাসক ছিলেন একজন। শুধু যুদ্ধ, পররাষ্ট্র ও অর্থ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে পরিচালিত হতো। বাকি প্রশাসন পরিচালিত হতো পৃথকভাবে।
১৯০৮ সালে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্য বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের সঙ্গে অধিভুক্ত করে। আর বসনিয়ায় অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের মূল আগ্রহের জায়গাটি ছিল কাঠ। বসনিয়ার উপত্যকাগুলো থেকে প্রচুর পরিমাণে কাঠ পাওয়া যায়। সেই কাঠ তারা নিয়ে যেত। কিন্তু তার বিনিময়ে স্থানীয় অধিবাসীরা কিছুই পেতেন না।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের অধিভুক্ত করায় সার্ব জাতীয়তাবাদী নেতাদের স্বপ্নে ধাক্কা লেগেছিল। কারণ, তাঁদের স্বপ্ন ছিল বলকান অঞ্চলের সব স্লাভ জনগোষ্ঠীকে একত্র করে গ্রেটার সার্বিয়া প্রতিষ্ঠা করা। এমন অবস্থায় বসনিয়ার ভেতরে ও বাইরে সার্ব জনগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জমা হতে থাকে। আর তাই সারায়েভোতে যুবরাজের সফরকে বসনিয়ার অনেক জাতীয়তাবাদী তরুণ ভালোভাবে নিতে পারেননি। তাঁরা ফার্দিনান্দকে নিশানা করার সিদ্ধান্ত নেন।
ফার্দিনান্দ ও তাঁর স্ত্রীকে গুলি করা গ্যাভরিলো প্রিন্সিপকে ঘটনাস্থলের কাছ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তিনি হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেন। বলেন, দেশপ্রেম এবং স্লাভ জনগণকে নিপীড়ন থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যেই এ হামলা চালিয়েছিলেন। গ্রেপ্তারের সময় প্রিন্সিপের বয়স ২০ বছরের কম হওয়ায় তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি। এর পরিবর্তে তাঁকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কারাগারে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে ১৯১৮ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।

যুদ্ধ ঘোষণা
সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দের হত্যার ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সম্রাট ফ্রাঞ্জ জোসেফ। তিনি এই হত্যার জন্য সার্বিয়াকে দায়ী করে ১৯১৪ সালের ২৩ জুলাই দেশটির কাছে কিছু কঠোর দাবিদাওয়া জানান।
সার্বিয়া বেশির ভাগ দাবি মেনে নিলেও সব দাবি মেনে নেয়নি। বিশেষ করে নিজেদের বিচারব্যবস্থায় বিদেশি কর্মকর্তাদের তদারকি বা হস্তক্ষেপের শর্তটি তারা প্রত্যাখ্যান করে। স্লাভ জাতিগোষ্ঠীর দেশ হওয়ায় রাশিয়ার সমর্থন পাওয়ার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিল সার্বিয়া। সে কারণে তারা দাবি প্রত্যাখ্যান করার মতো সাহস করেছিল বলে মনে করা হয়ে থাকে।
ইউনিভার্সিটি অ্যাট অ্যালবানির ইতিহাসের অধ্যাপক রিচার্ড ফোগার্টি মনে করেন, মিত্রদের সমর্থন থাকার বিষয়টি জানালে যুদ্ধ এড়ানো যাবে বলে ভেবেছিলেন অস্ট্রিয়া–হাঙ্গেরি ও সার্বিয়ার অনেক নেতা। তাঁদের ধারণা ছিল, রাশিয়া সার্বিয়ার পাশে আছে জেনে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি দেশটিতে আক্রমণের সাহস করবে না। আবার অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির ধারণা ছিল, জার্মানি তাদের পাশে আছে জেনে রাশিয়াও কোনো পদক্ষেপ নেবে না।
সব দাবি না মানায় ক্ষুব্ধ হয়ে ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। দেড় সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে থাকে। যুদ্ধ ইউরোপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
কারা কারা যুদ্ধে জড়িয়েছিল
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর অনেক আগেই ইউরোপের দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার জন্য দুটি বড় জোট গঠন করেছিল। এসব জোটের সদস্যদেশগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কোনো একটি দেশ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে অন্য সদস্যরাও তার পাশে দাঁড়াবে। ফলে ১৯১৪ সালে যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইউরোপ কার্যত দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একদিকে ছিল ট্রিপল অ্যালায়েন্স (কেন্দ্রীয় শক্তি), অন্যদিকে ট্রিপল আন্তঁত (মিত্রশক্তি)।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এই দুটি জোটই মূলত একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিল। কেন্দ্রীয় শক্তি বা অক্ষশক্তি জোটে ছিল জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া এবং ওসমানীয় সাম্রাজ্য। আর মিত্রশক্তি জোটে ছিল ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ইতালি, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র। ইতালি শুরুতে কেন্দ্রীয় শক্তির সঙ্গে থাকলেও পরে জোট পরিবর্তন করে মিত্রশক্তিতে যোগ দেয়।
যুদ্ধ ঘোষণার পর প্রতিটি দেশ তাদের সেনা ও নৌবাহিনীকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করে। এরপর বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে তীব্র লড়াই শুরু হয়। এর বেশির ভাগই হয় ফ্রান্স ও বেলজিয়ামে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইউরোপের বাইরের অনেক দেশও এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। কেউ কেন্দ্রীয় শক্তির পক্ষে, আবার কেউ মিত্রশক্তির পক্ষে যুদ্ধ করে। এর ফলে ইউরোপের সংঘাত ধীরে ধীরে একটি বিশ্বযুদ্ধে পরিণত হয়।
সার্বিয়ার সঙ্গে আগে থেকেই সামরিক জোট থাকায় রাশিয়া সার্বিয়ার পক্ষ নিয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির মিত্র হওয়ায় জার্মানি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর জার্মান সেনাবাহিনী বেলজিয়ামে হামলা করে। বেলজিয়ামের নিরপেক্ষতা রক্ষা এবং ফ্রান্সকে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি থাকায় যুক্তরাজ্যও জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।